মানুষের সঙ্গে প্রতারণার দায়ে অভিযুক্ত কোন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কাছে কত গ্রাহকের কত টাকা আটকে আছে, তা এখন পর্যন্ত বের করতে পারেনি সরকার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) মধ্যে বিষয়টি ঘুরপাক খাচ্ছে। যদিও পেরিয়ে গেছে প্রায় পাঁচ মাস। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত বছরের ২৪ আগস্ট ৯টি ই–কমার্স প্রতিষ্ঠানের ভেতরের অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নিতে বলেছিল বাংলাদেশ ব্যাংককে। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে ধামাকা শপিং, আলেশা মার্ট, ই–অরেঞ্জ, সিরাজগঞ্জ শপ, আলাদীনের প্রদীপ, বুমবুম, আদিয়ান মার্ট, নিড ডট কম এবং কিউকম। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর কার কাছে গ্রাহক ও পণ্য সরবরাহকারীরা কত টাকা পাবেন, তা তদন্ত করে বের করতে বলা হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক গত মাসে শুধু ধামাকা শপিংয়ের ব্যাপারে একটি প্রতিবেদন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। বাকিগুলোর হালনাগাদ চিত্র তাহলে কী, জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে জেনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকে কারাগারে আছেন। অনেক অফিস বন্ধ। তারপর আছে কোভিড-১৯–এর প্রকোপ। এত সব সীমাবদ্ধতার কারণে পরিদর্শনের কাজটি দ্রুততরভাবে হয়নি। তবে এটা ঠিক যে কাজ এগোচ্ছে।’ দেশে গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে একে একে বেশ কিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা ও গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পণ্য না দেওয়ার বিষয়টি বেরিয়ে আসে। ওই সময় কিছু প্রতিষ্ঠান দাবি করেছিল, তাদের গ্রাহকদের একাংশের টাকা ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা বা পেমেন্ট গেটওয়েতে আটকে আছে। একটি ছিল কিউকম। এই প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের একাংশের পেমেন্ট গেটওয়েতে থাকা টাকা ফেরত দেওয়া শুরু হয়েছে গতকাল সোমবার থেকে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কিউকমের ৬ হাজার ৭২১ গ্রাহকের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। পেমেন্ট গেটওয়ে প্রতিষ্ঠান ফস্টার করপোরেশনের কাছে এ গ্রাহকদের আটকা ছিল ৫৯ কোটি ৫ লাখ টাকা। ওই তালিকা থেকে ২০ জনকে গতকাল সচিবালয়ে ডেকে ৪০ লাখ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। এ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ময়মনসিংহ থেকে আসা গ্রাহক শফিকুল ইসলাম বলেন, লোভের বশবর্তী হয়ে তিনি পাঁচটি মোটরসাইকেলের ক্রয় আদেশ দিয়েছিলেন। এতে তাঁর খরচ হয়েছিল ৫ লাখ ৫১ হাজার টাকা। সেই টাকা তিনি ফেরত পেয়ে এখন খুশি। অনুষ্ঠানে বাণিজ্যসচিব তপন কান্তি ঘোষ, ই–কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইক্যাব) সভাপতি শমী কায়সারসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। তপন কান্তি ঘোষ বলেন, গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার শুভসূচনা হলো। পরের ধাপে অন্যরাও পাবেন। অবশ্য যে টাকা ব্যাংক ব্যবস্থায় আছে, গ্রাহকের তালিকা আছে, সেটা ফেরত দিতে পাঁচ মাস লেগে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। গ্রাহকেরা বলছেন, অন্য যে প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকের টাকা গেটওয়েতে আছে, সেটা ফেরত দিতে কত দিন লাগাবে মন্ত্রণালয়? যাদের টাকা লেনদেন ব্যবস্থা থেকে কোম্পানির হিসাবে জমা হয়েছে, সেটা আদৌ কি ফেরত পাওয়া যাবে? এত দিন পর কমিটি পাঁচ মাস পর কোন প্রতিষ্ঠানের কাছে, কত গ্রাহকের, কত টাকা আটকা, তা বের করতে আরেকটি কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে গতকাল জানান বাণিজ্যসচিব তপন কান্তি ঘোষ। জানা গেছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, ইক্যাব, পুলিশ সদর দপ্তর ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) থেকে একজন করে প্রতিনিধি রাখা হবে কমিটিতে। অভিজ্ঞ হিসেবে এ ছাড়া রাখা হবে ই–কমার্স প্রতিষ্ঠান চালডাল ডট কমের একজন প্রতিনিধি। কার্যপরিধি ঠিক করে আজ মঙ্গলবার কমিটি গঠন করা হতে পারে বলে সূত্রগুলো জানায়। সূত্র আরও বলছে, কমিটির কাজ হবে কোন ই–কমার্স প্রতিষ্ঠান কী অবস্থায় আছে এবং তাদের গ্রাহকসংখ্যা ও পাওনার সংখ্যা কত—এসবের একটি হালনাগাদ চিত্র তৈরি করা। তাদের এক মাস সময় দেওয়া হবে। এর আগে গত বছরের জুনে ইভ্যালি এবং ডিসেম্বরে ধামাকা শপিং নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। মামলার তালিকা পায়নি বাংলাদেশ ব্যাংক ই-কমার্স নিয়ে গত ২১ ডিসেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকের কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের উপমহাব্যবস্থাপক রাফেজা আক্তার বলেছেন, কোন কোন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে, তার কোনো তালিকা বাংলাদেশ ব্যাংকে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠানো হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গতকাল পর্যন্ত এ তালিকা পায়নি তারা। মামলার তালিকা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্যের প্রসঙ্গ নিয়ে জানতে চাইলে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার ও মামলাগুলোর তদন্ত তদারক কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির গতকাল মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ই–কমার্স নিয়ে সারা দেশের মামলার সংখ্যা জানা নেই। পুলিশের সদর দপ্তর এটা সমন্বয় করছে। আমাদেরটা আমরা সদর দপ্তরে পাঠিয়ে দেব। সেখান থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পেয়ে যাবে।’ এদিকে সিআইডির পক্ষ থেকে পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (সাইবার ক্রাইম) মো. কামরুল আহসান এক মাস আগেই বৈঠককে জানিয়েছিলেন, ডিজিটাল কমার্স খাতের ৯০ শতাংশ মামলা তারা পরিচালনা করেন। সিআইডি ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সূত্র মতে, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকের কত টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি তারা। তবে ই-কমার্সের নামে প্রতারণা করে মানুষের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ১৫টি প্রতিষ্ঠানের নামে ৪১টি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় আসামি ১১০ জন, আর গ্রেপ্তার ৩৬ জন। ‘আর কত অপেক্ষা করব’ ঢাকার শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন, যিনি একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানে একটি মোটরসাইকেলের ক্রয়াদেশ দিয়েছিলেন, তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান প্রকাশ্যে ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যবসা করেছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা এসব প্রতিষ্ঠানের প্রশংসা করেছিলেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রতারণা রুখতে আগাম ব্যবস্থা নিতে পারেননি। এখন কত টাকা, কার টাকা ব্যাংক ব্যবস্থায় আছে, সেটা জানাতেও মাসের পর মাস লাগাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আর কত অপেক্ষা করব।’