রাজধানীর দুটি মাদরাসা থেকে পাঁচ শতাধিক কুরবানির ঈদে পশু জবাই করার ছুরি জমা নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) লালবাগ বিভাগ। এ ঘটনায় চকবাজার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে ছুরিগুলো জমা দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১ এপ্রিল) রাতে ডিএমপির লালবাগ বিভাগের চকবাজার জোনের অতিরিক্ত উপ কমিশনার কুদরত ই খোদা গণমাধ্যমকে বলেন, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ আমাদের জানিয়েছে, এগুলো তারা কোরবানির ঈদের সময় পশু কাটার কাজে ব্যবহার করেন। তাদের এই দাবির সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে পর্যবেক্ষণ করে ছুরিগুলো চকবাজার থানায় এনে জমা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে চকবাজার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। মাদরাসা কর্তৃপক্ষ কোরবানির ঈদের সময় এসব ফেরত চাইলে আমরা আবার দিয়ে দেব। এ নিয়ে রীতিমত মানুষকে বিভ্রান্ত করার মিশন হাতে নিয়ে নামতে দেখা গেছে কিছু ইসলাম বিদ্ধেষি পত্রিাকাকে। যারা মিডিয়া তান্ডব চালিয়ে ইসলাম ও ইসলামী প্রতিষ্ঠান, ইসলামী ব্যাক্তিদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চায়। সমকাল পত্রিাকাটি শিরোনাম দিয়েছে “ঢাকার দুই মাদ্রাসা থেকে ৬০৩ ছোরা উদ্ধার”। এমন ভাবে নিপোর্ট সাজিয়েছে যেন আবহমান থেকে চলে আসা কোরবানি সম্পর্কে তারাও জানে না, জনগণও জানে না। এ যেন দেশে নতুন কোন বিষয় বা ঘটনা। বেশি প্রচারের দাবিদার প্রথম আলোর শিরোনাম-“রাজধানীর দুই মাদ্রাসা থেকে ৫৯০ ছুরি জব্দ”। এমন ভাবে রিপোর্ট বানিয়েছে পুলিশের বক্তব্যকে গৌণ করে মাদ্রাসায় বছরের পর বছর কোরবানির জন্য থাকা ছুরিগুলোই অপরাধ। মাদ্রাসা গুলো অপরাধ করেছে। এ সকল ছুরি দিয়ে যে এ পর্য়ন্ত কোন অপরাধ ঘটেনি তার কোন বক্তব্য তারা ছাপেনি। বরং সামাজিক একটি ধর্মীয় প্রয়োজনের মাধ্যমকে একপেশে রিপোর্টের মাধ্যমে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রয়াস তাদের রিপোর্টে লক্ষ্যণীয়। একমাত্র যুগান্তর পত্রিাকাতে কোরবানির ছুরি শব্দটি এসেছে যা সমগ্র ঘটনার কেন্দ্রীয় পয়েন্ট। দলমত নির্বিশেষে ধর্মপ্রাণ মানুষেরা এই বিভ্রান্ত সিন্ডিকেট প্রচারণায় বিব্রত। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়াও জানিয়েছে। অনেকে বলেছেন- কোরবানি নিয়ে এদেশে যে ষড়যন্ত্র চলে এটাও তার ধারাবাহীকতা। এদিকে ইসলামবাগ জামিয়া ইসলামিয়া মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা মুঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী জানান, ‘পুলিশ ছুরি নেওয়ার আগে সাদা কাগজে ছুরির বিবরণ, কী কাজে ব্যবহৃত হয় (কুরবানির পশু যবেহ কাজে) তার প্রত্যয়নমূলক বর্ণনাসহ শিক্ষকের স্বাক্ষর এবং পুলিশের স্বাক্ষরসহ কুরবানির ছুরির নিরাপত্তার একটি লিখিত প্রমাণপত্র লেখার পর পুলিশ প্রশাসন ছুরি নিয়ে যান।’ তিনি আরও জানান, ‘সারাদেশে ছোট-বড় সকল সকল মাদরাসা ছুরি সংরক্ষণ করা হয়। বছরের একটা দিন শুধু কুরবানির কাজেই ছুরিগুলো ব্যবহার করা হয়। এছাড়া অন্য কোনো কাজে ছুরি গুলো ব্যবহাররে কোনো রেকর্ড কেউ দেখাতে পারবে না। সুতরাং ছুরি জব্দের নামে আতঙ্ক ছড়ানো কিংবা আমাদের আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু নেই। ঘরের কাজের দা, বটির মতোই আমরা ছুরিগুলো সংরক্ষণ করি। অতএব দেশের গণমাধ্যমকে এ নিয়ে আতঙ্ক না ছড়ানোর অনুরোধ জানান তিনি।’ যেই জিনিসগুলো প্রায় সকল কওমি মাদরাসায় রয়েছে সেগুলো নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ নিয়ে যাওয়ায় আমাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে এটটাকে বিতর্কিত শিরোনাম বানিয়ে প্রচার করার কওমি মাদরাসার ক্লিন ইমেজ ও ভাবমর্যাদা নষ্টের একটি অপকৌশল মাত্র। আমরা এটা হবে না বলেই মনে করি। এদিকে লালবাগের জামেয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া মাদরাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস মাওলানা জুবায়ের আহমদ বলেন, ‘পুলিশ সাদা কাগজে সই নিয়ে কোরবানির কাজে ব্যবহৃত ছুরিগুলো তাদের জিম্মায় নিয়ে গেছে। আগামী কোরবানির সময় ছুরিগুলো তারা ফেরত দেবে বলে জানিয়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ছুরিগুলো শুধু কুরবানি ঈদের দিন জনগণের পশু জবাইয়ের জন্যই ব্যবহার করি। যার মাধ্যমে তাদের উপকার হয়। অতএব এটা নিয়ে আতঙ্ক না ছড়াই। সাধারণ মানুষের মাঝে বিরুপ মন্তব্য প্রচার না করারও আহবান জানান তিনি।’ এ বিষয়ে কথা বলেছিলাম রাষ্ট্রচিন্তক ও সমাজ বিশ্লেষক মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভীর সাথে। তিনি জানান, ‘এখানে প্রথম বক্তব্য হল, পুলিশ ছুরিগুলো জব্দ করেছে মাদরাসা থেকে। এটা কিসের ভিত্তিতে করেছে ও কে তাদেরকে জব্দ করতে বলেছে এটা তাদেরকে জিজ্ঞেস করা উচিত।’ তারপর মিডিয়া এটাকে প্রচারের ক্ষেত্রে ‘কুরবানীর ছুরি’ শব্দটি উল্লেখ না করে প্রচার করেছিল কেনো? এটাও তাদেরকে জিজ্ঞেস করা উচিত। যারা নিজেরাও জানেন এটা কোরবানির ছুরি। তারপরও উল্লেখ করেননি এই জবাবটা তাদের থেকে নেওয়া উচিত। সবশেষ যে কথাটি বলবো সেটি হচ্ছে, ‘যদি সরকার চায় কুরবানির পশু জবাইয়ের ছুরি নিয়ন্ত্রণে নিতে। তাহলে তারা থানায় একটা আলমারি রাখুক। যেখানে ছুরি গুলো সারাবছর জমা রাখবে আর কোরবানির সময় ফেরত দেবে। আবার কাজ শেষে তারা জমা নিয়ে নিবে। তবে এটার জন্য আলাদা আইন করতে হবে। এভাবে হয়রানি করার কিংবা আতঙ্কিত করার কোন মানে নেই। এবং কুরবানির প্রতি বিদ্ধেষ, মাদরাসার প্রতি খারাপ ধারণা ও ধর্মপ্রাণ মুসলিম সমাজের প্রতি জনমনের খারাপ ধারণা তৈরির ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে মানুষ মনে করবে।’